মঙ্গলবার ১৬ আগস্ট ২০২২ ১ ভাদ্র ১৪২৯

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক
একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হলেও নজরে ছিল না কারোও
আ. আজিজ, শ্রীপুর,গাজীপুর
প্রকাশ: শনিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ৭:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হলেও নজরে ছিল না কারোও

একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হলেও নজরে ছিল না কারোও

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক প্রতিষ্ঠার পর বেশ আলো ছড়ালেও হঠাৎ করে বিদেশী প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনায় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পার্ক প্রতিষ্ঠার পর চলতি বছরই সবচেয়ে বেশী প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এ পার্কে। নানা বিষয় সামনে রেখে সরকার পার্ক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে। সরিয়ে দেয়া হয়েছে পার্কের প্রকল্প পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসককে।

তবে ইতিপূর্বে পার্কে নানা ধরনের প্রাণীর মৃত্যু হলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হলো।

ধারাবাহিক ভাবে জেব্রা মারা গেছে ৩২টি ঃ ২০১৩- ২০১৫সাল পর্যন্ত দুই ধাপে দক্ষিন আফ্রিকা থেকে মোট ২৫টি জেব্রা পার্কে আনা হয়।

এসব জেব্রা অবমুক্ত করার পর নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে ২০১৫সালের মধ্যেই ১১টি জেব্রার মৃত্যু হয়। পার্কে প্রথম জেব্রা শাবকের জন্ম হয় ২০১৭সালের ১৪মে। সেই থেকে ২০২১সালের ১৮অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২৫টি শাবকের জন্ম হয়। এর মধ্যে ২০২১সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে জেব্রা মারা যায় ১০টি জেব্রা। চলতি বছরের ২জানুয়ারী থেকে ২৯জানুয়ারী পর্যন্ত আরো ১১টি জেব্রার মৃত্যু হয়। সবমিলিয়ে পার্কে ২৫টি জেব্রা শাবকের জন্ম হলেও মারা গেছে ৩২টি জেব্রা।

এর আগে ২০১৭সালের ১৭মে পার্কে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে দুটি জিরাফের মৃত্যু হয়। তখন পার্ক কর্তৃপক্ষ ময়না তদন্ত করে ধারনা করেছিল ব্যাকটেরিয়া সংক্রমনকেই তারা মারা গেছে। ২০১৯সালের ১৭জানুয়ারী পার্কের একমাত্র পুরুষ জিরাফটিও মারা যায় চিকিৎসকের ভূল চিকিৎসায়। যদিও জিরাফের যক্ষা রোগের কথা বলেছিল তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। 

গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর পার্কের একটি সাদা সিংহ সারা যায়, পার্ক কর্তৃপক্ষের দাবী ছিল গরমে হিটষ্ট্রোকে সে মারা যায়। এছাড়াও গত বৃহস্পতিবার পার্কে ফের অসুস্থ হয়ে একটি সিংহীর মৃত্যু হয়। 

গত ১২জানুয়ারী পার্কে একটি বাঘের মৃত্যু হয় এই পার্কে । চিকিৎসকদের দাবী এ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়ে বাঘটির মৃত্যু হয়। এর পূর্বে আরো একটি বাঘের মৃত্যু হয়। তথন পার্ক কর্তৃপক্ষ দাবী করেছিল গলায় গুইশাপ আটকে তার মৃত্যু হযেছিল। 

এছাড়াও পার্ক প্রতিষ্ঠার পর  দর্শনার্থীদের জন্য বেশ কয়েকটি ক্যাঙ্গারু বিদেশ থেকে আনা হলেও ধারাবাহিক ভাবে মৃত্যু মধ্য দিয়ে তা এখন শূন্যতে পৌছেছে।  
বারবার জেব্রার মৃত্যু হলেও তা রোধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হলো এই সাফারী পার্কটিতে।

দায় সারা ময়না তদন্ত ও কমিটি করেই ক্ষান্ত পার্ক কর্তৃপক্ষ ঃ এদিকে পার্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হলেও দায়সারা ময়নাতদন্ত করেই ক্ষান্ত ছিল পার্ক কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি প্রাণীর মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন ও মৃত্যু রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগের অভাব ছিল তাদের মধ্যে। 

সদ্য পার্ক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া সাফারী পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তবিবুর রহমান বলেন, ইতিপূর্বে প্রাণীর মৃত্যু হলেও তার মেয়াদে এই প্রথম বড় ধরনের প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে এবার। প্রাণীর মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন সেম্পল কালেকশন করে তা পাঠিয়ে দেয় ল্যাবে। এছাড়াও এ সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট বিভাগে। সেখানেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার কথা। 

এদিকে সাফারী পার্ক সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, এই পার্কের বিদেশী প্রাণী ব্যবস্থাপনায় চরম অনিয়ম রয়েছে। জেব্রা যেখানে বসবাস করে সেখানে রয়েছে বিশাল শালবন। সেখানে জেব্রার খাবারের অনুপযোগী উদ্ভিদ ও লতাপাতা রয়েছে। রয়েছে বদ্ধ নালা। যেখানে জমে থাকা পানি রয়েছে। জেব্রার বসবাসের জন্য অনেকটা অনুপযুক্ত এই এলাকা। এই কর্মকর্তার ধারনা মতে, খাবার থেকেই এবার জেব্রার ব্যাকটেরিয়ায় পেয়েছে। এছাড়াও জেব্রার সাথেই বিচরণ রয়েছে জিরাফ, ওয়াইল্ড বিস্ট, কমন ইল্যান্ডের। সাথে রয়েছে শত শত বানর। পার্কের খাবার পরিবেশন করেন বিভিন্ন ঠিকাদাররা। এসব খাবার পরীক্ষা নিরিক্ষারও কোন ভালো ব্যবস্থা নেই। এছাড়াও বিদেশী প্রাণীর বিষয়ে তেমন অভিজ্ঞতা নেই পার্কের অনেকেরই। এ বিষয়ে প্রশিক্ষনের জন্য আমাদের দেশেও তেমন ব্যবস্থা এখনও গড়ে উঠেনি।  তাই বিদেশী প্রাণী ব্যবস্থাপনায় নজর না দিলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে হতে পারে। 

এ বিষয়ে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যাবিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, বিদেশী প্রাণীর ব্যবস্থাপনা ও আমাদের দেশীয় প্রাণীর ব্যবস্থাপনায় বিস্তর ফারাক রয়েছে। তাই বিদেশী প্রাণীর দিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। সেখানে প্রতিটি বিদেশী প্রাণীর ব্যবস্থাপনা ও রোগ সম্পর্কে সম্মক ধারনা রাখতে হবে। সাথে তাদের  উপযোগী বাসস্থান, বিচরণ ভূমি, খাবার ও রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।  রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে টিকার আওতায় আনতে হবে এসব প্রাণীদের। কোন  মতেই অবহেলা করা যাবে না, একটি প্রাণীর মৃত্যুর পর দ্রুত এর কারণ উদঘাটন করে পরবর্তী প্রাণীর মৃত্যুরোধের উদ্যোগ নিতে হবে।   

জাতীয় চিরিয়াখানার সাবেক কিউরেটর ড.এ বি এম শহিদুল্লাহ বলেন,কয়েকদিনের ব্যবধানে যেভাবে প্রাণীগুলোর মৃত্যু হয়েছে তা সত্যিই হতাশাজনক। প্রাথমিক অবস্থায় আমরা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমনকে দায়ী করছি। এছাড়াও আরো বেশ কিছু গবেষনাগারের ফলাফল এখনও পায়নি। সবমিলিয়ে তদন্ত হচ্ছে, তিনি নিজেও সে কমিটিতে রয়েছেন তাই এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছেন না। তবে তিনি বলেন, জেব্রার মৃত্যুরোধে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত প্যানেল ১০দফা নির্দেশনা দিয়েছে। তদন্তের পরে আমরা আরো পর্যবেক্ষন দেব।

সাফারী পার্কের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক মোল্লা রেজাউল করিম বলেন, এটি দক্ষিন এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম একটি সাফারী পার্ক। এখানে  বিদেশী নানা ধরনের বন্যপ্রাণী রয়েছে। আমাদের এখানে অনেকেই রয়েছেন যারা বিদেশী বন্যপ্রাণীর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তেমন কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাই এসব বিদেশী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার কৌশলগুলো আমাদের রপ্ত করতে হবে। সেজন্য সেখানে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেহেতু এটি আমাদের দেশের এতিহ্যবাহী  প্রতিষ্ঠান তাই এর স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই সরকার করবে। 

স্বদেশ প্রতিদিন/নিশাদ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: +৮৮০২-৮৮৩২৬৮৪-৬, মোবাইল: ০১৪০৪-৪৯৯৭৭২। ই-মেইল : e-mail: swadeshnewsbd24@gmail.com, info@swadeshpratidin.com
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।