মঙ্গলবার ১৬ আগস্ট ২০২২ ১ ভাদ্র ১৪২৯

সং এবং ভয়ংকর সং
মানিক মুনতাসির
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই, ২০২২, ৫:৪৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

মানিক মুনতাসির

মানিক মুনতাসির

আপনাদের গোপাল ভাঁড়ের কথা মনে পড়বে যেকোনো সময়। কেননা এটি একটি অমর চরিত্র। ইতিহাস বলছে, গোপাল ভাঁড় ছিলেন মধ্যযুগে নদিয়া অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত রম্য গল্পকার, ভাঁড় ও মনোরঞ্জনকারী। তাঁর আসল নাম গোপাল চন্দ্র প্রামাণিক। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়া জেলার প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন সৎ ও বুদ্ধিমান। বুদ্ধি ও সৎ সাহস থাকার কারণে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে তাঁর সভাসদদের মধ্যকার নবরত্নদের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন রাজার বিপদেরও বন্ধু। যেকোনো সংকটে রাজাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন। আবার অন্য সময় মজার মজার গল্প, রম্য, কৌতুক বলে, লিখে ও শুনিয়ে সভাসদকে চাঙা রাখতেন। ইতিহাসে তাঁর নাম নানাভাবে ফিরে আসে। সমগ্র ভারতবর্ষে। তবে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময়কাল বা তারিখ, সাল ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না৷

এরপর পৃথিবী বিখ্যাত আরেক কৌতুক চরিত্র  চার্লি চ্যাপলিন (ইংরেজি: Charlie Chaplin) নামেই বেশি পরিচিত স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন।  যার জন্ম: চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন; ১৬ এপ্রিল ১৮৮৯, মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ (বয়স ৮৮);। তিনি অসংখ্য সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন। পরবর্তী সসময়ে তাঁরই নামে সিকুয়্যাল হয়েছে বহু। যা এখনও তুমুল জনপ্রিয়।

এ দুজনই ছিলেন সমাজ তথা দেশের জন্য বিনোদন এবং বেশ উপকারী।

এখনও পৃথিবীর বহু দেশে এমন গোপাল ভাঁড় রয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সমাজের সংয়েরা একটা মুখোশ পরে থাকেন। ভাব ধরেন তারা খুবই মানবিক এবং ভদ্র। এমনকি নিজেকে তারা সমাজের জন্য অনিবার্যও মনে করেন।

শুধু তাই নয়, আগে শাসকেরা সং পুষতেন বিনোদন পেতে আর এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে সং রয়েছে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে। জনগণকে মজা দিতে গিয়ে রীতিমত শূলে চড়াচ্ছেন। নানা গল্প আর কাহিনি শুনিয়ে জনগণকে ভেল্কিবাজি দেখাচ্ছেন। যেমন উন্নয়নের চরকে চড়িয়ে জাতিকে মুলো ধরিয়ে দিয়েছে শ্রীলংকার রাজাপাকশে সং।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন- শ্রীলংকা, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, লেবানন, সুদান, সিরিয়া ধ্বংসের পেছনেও রয়েছে এমন সংয়ের ভূমিকা। বর্তমানে রাশিয়া দ্বারা আক্রান্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লোদিমীর জেলেনস্কিকেও সং হিসেবে গণ্য করছে পৃথিবীর একাংশ। অবশ্য প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি সত্যিই একজন কৌতুক অভিনেতাই ছিলেন। পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত এবং খোদ ইউক্রেনবাসী জেলেনস্কিকে মহান দেশপ্রেমিক আখ্যা দিচ্ছেন। যদিও দেশের বেসামরিক মানুষ প্রতিদিনই মারা পড়ছে রাশিয়ার বন্দুকের গুলি আর গোলায়। হয়তো দু'দেশের এ সমস্যার সমাধান করা যেত অতি সহজেই।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলাল্ড ট্রাম্পও এক সময় সংই (রেসলার) ছিলেন। অবশ্য তাঁর দেশপ্রেম আছে বলেই হয়তো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বেচ্ছায় সরে গেছেন। দেশটি এখনও টিকে আছে নিজেদের ক্ষমতামত। হয়তো সে দেশের মানুষ বুঝে ফেলেছিল ট্রাম্পের মতো সংয়ের কাছে নিরাপদ নয় আমেরিকা। তাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। 

এদিকে শ্রীলংকা ডুবেছে রাজাপাকশের ভাঁড়ামিতে। অবশ্য পাকশে সরকারের ছিল সীমাহীন দুর্নীতিও। স্বেচ্ছাচারিতা, একগুয়েমি ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর অনুৎপাদন নীতিই ডুবিয়েছে শ্রীলংকাকে। এখন অবশ্য চলছে নানা উত্থান-পতন। জনগণ দিচ্ছে ভুলের মাশুল। অন্ধকার থেকে অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে শ্রীলংকা। পাকিস্তানের অবস্থাও একই রকম প্রায়। ইমরান খানকে হটিয়ে একাধিক সংয়ে বসিয়েও বাঁচানো যায়নি সে দেশের স্থিতিশীলতা। অবশেষে আবারও হয়তো ইমরান খানের দলই জিতে চলেছে সেখানে।

নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে কোনো প্রকার ছলচাতুরির আশ্রয়, বিরোধীকে দমন। হত্যা, ধর্মীয় ইস্যুকে উস্কে দেওয়া। ভাঁড়ামি কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা ক্ষমা করেনি কোনো শাসককেই। জার্মানির হিটলারও রক্ষা পাননি। শেষ পর্যন্ত একাকিত্বের প্রকোষ্ঠে গিয়ে আত্মহননই বেছে নেন হিটলার। তবু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না মানুষ৷ কারণ মানুষ আসলে মানুষই নয়। আবার অমানুষও নয়। মাঝামাঝি কিছু একটা।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে যা চলছে তাতে সমাধান কোথায় তা পরিষ্কার নয়। পরিমিতবোধ মানুষকে ভদ্রতা শেখায়। আর অপচয়রোধী মানুষ সঞ্চয়ী শেখায়। একই সাথে জনস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত শাসককে জনবিচ্ছিন্ন করে। অতিরিক্ত তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা মানুষের পেটে দু'ধরনের সমস্যা হয়। এক- বদ হজম, দুই- ক্ষুধামন্দা। অর্থাৎ এমন প্রকৃতির মানুষ খেলে হজম করতে পারে না নয়তো খেতেই পারে না।

আরেকটা বিষয় হলো বাড়িয়ে বলা বা ফাঁপড়বাজি করা। নিজের যতটুকু শক্তি আছে তা বিচার করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে না পরালে পরাজয় নিশ্চিত। আবার সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড় নিলে কোমরও বেঁকে যেতে পারে। এসব ভাবা উচিত। তারচেয়েও বড় ভয়ংকর হলো ফাঁপড়বাজি করা।

ধরুন আপনি জঙ্গলে যাবেন। যেখানে বাঘও আছে। তাহলে আপনাকে সে রকম প্রস্তুতিই নিতে হবে যাতে করে বাঘ আপনাকে ছুঁতে না পারে। কিন্তু আপনি মুখের জোরে হুমকি, ধামকি দিয়ে যদি বাঘ তাড়াতে চান তবে মৃত্যুই অনিবার্য। সে মৃত্যু হবে স্রেফ এক সং এর মৃত্যু। যদি আপনি রাজাও হন তবুও ইতিহাস আপনাকে সং হিসেবেই মনে রাখবে৷ অতএব সিদ্ধান্ত আপনার।

লেখক: সাংবাদিক

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: +৮৮০২-৮৮৩২৬৮৪-৬, মোবাইল: ০১৪০৪-৪৯৯৭৭২। ই-মেইল : e-mail: swadeshnewsbd24@gmail.com, info@swadeshpratidin.com
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।